স্কুলের দেয়ালে আজও অম্লান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার টাঙ্গাব ইউনিয়নে বাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়টি অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির দেয়ালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা এখনো অম্লান। মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবের এই বীরত্বের কাহিনী আজো মানুষকে যুদ্ধ দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিদ্যালয়ে আয়োজিত জাতীয় দিবসগুলোতে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এই বীরত্বগাথা তুলে ধরেন।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযোদ্ধের সময় সারা দেশে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হানাদার বাহিনী মার খেয়ে পিছু হটছে, তখন অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী উপজেলার টাঙ্গাব ইউনিয়নের বাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে।
বিদ্যালয়টির পেছন দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। হানাদার বাহিনী বিদ্যালয়ের এক তলা ল্যাবরেটরি ভবনের ছাদে বালুর বস্তা দিয়ে বাংকার তৈরি করে অবস্থান নেয়। পাক হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় আশপাশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধের পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে কক্ষে আটকে বা গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতন চালাতো। এ সময় টাঙ্গাব বটতলা পাল বাড়ির কয়েকজন হিন্দুসহ সাত-আটজনকে ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যার পর পাশের ব্রহ্মপুত্র নদী ফেলে দেয় হানাদার বাহিনী।
খবর পেয়ে প্রায় ৬০ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা বাশিয়া গ্রামে অবস্থান নেন। পরে এখানে ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে রেখে বাকিরা দক্ষিণ দিকে চলে যান। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের আসার খবর পেয়ে স্থানীয় ১৪ জন রাজাকার পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। ১৪ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনজুর কাদেরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে হানাদার বাহিনীর শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সারাদিন সারারাত চলে যুদ্ধ।
ওইযুদ্ধে বামনখালী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মইজ উদ্দিন শহীদ হন। একপর্যায়ে রাত পোহানোর আগেই পাক হানাদার বাহিনী রাজাকারদের রেখে পেছনের ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ধরে পালিয়ে বারইহাটি ক্যাম্পে যায়। সেখানে আরও মানুষ হত্যা করে নিগুয়ারী কেল্লার ব্রিজ পার হয়ে কাওরাইদ রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেনযোগে পালিয়ে যায়। বাশিয়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের দেওয়ালে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোড়া গুলির চিহ্নগুলো আজো বাশিয়া যুদ্ধের মহান স্মৃতি বহন করছে।

বাশিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন মাস্টার বলেন, বাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পাক হানাদার বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল। সেজন্য এই ক্যাম্পে হানাদার সৈন্য সংখ্যা কম ছিল। তাই এ যুদ্ধে ওরা ভয় পেয়ে অন্ধকারে পালিয়ে গেছে এবং আমাদের জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছে। তবে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কখনো বাঁচা-মরার কথা চিন্তা করিনি। জীবনপণ যুদ্ধ করেছি। আমাদের প্রিয় সহচর বীর মুক্তিযোদ্ধা মইজ উদ্দিনকে হারিয়েছি।
টাঙ্গাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন সাগর বলেন, বাশিয়া যুদ্ধ ছিল স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের যুদ্ধ।
বাশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লতিফ খান বলেন, আমার বিদ্যালয়ের দেওয়ালে লেগে থাকা একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিগুলো যত্ন করে রাখা হয়েছে। প্রতিবছর বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের সময় শিক্ষার্থীরা এই স্মৃতিচিহ্ন দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনি শুনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.